সাক্ষাৎকার

আড়ালে থেকেই খুঁজেছি আত্মতৃপ্তি


রুবায়েত ইসলাম
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ ইং ১৮:১৮


‘‘ভুলের মতো সুন্দর কিছু হয় না। আমার কাছে মনে হয় এই ভুলটা আমার একটা ইনভেস্টমেন্ট। এই ভুলটা আমাকে সামনে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিবে। সামনের পথ দেখিয়ে দেবে। যে ভুল করে সে প্রতিদিন শুধরায়।’’


 

গীতিকার মেহেদী হাসান লিমন। যার হাত দিয়ে অসংখ্য হিট গানের জন্ম। নিজে থাকেন প্রচার বিমুখ। এই গীতিকার গানের একজন বড় শ্রোতাও। যেকোন গান শোনেন। স্কুল জীবন থেকে দু’ একলাইন করে গান লেখা শুরু। তিনি দাবি করেন, তার গান শুধু এক শ্রেণির মানুষের জন্য না, তিনি গান রচনা করেন সবার জন্য। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব করেন না। গান রচনার মাধ্যমে মানুষের অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে চান তিনি। মানুষের ভালোলাগাই তার প্রাপ্তি। স্বপ্ন দেখেন বাংলা গানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার। যতদিন গান রচনা করার শক্তি থাকবে ততদিন তিনি চেষ্টা করবেন বাংলা গান যেন সারা বিশ্ব শোনে। নিউজরুমকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে আসে এসব কথা।।

| বিশ্ব মহামারিকালে থাকছেন ঘরেই। দেশে মহামারির প্রভাব শুরুর পর ঘরে থেকেই এ পর্যন্ত কয়েকটি কাজ করেছেন।

লিমন বলছিলেন: গেল পহেলা বৈশাখের জন্য করা অনেকগুলো কাজ ছিল। যেগুলো পরে ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায়। এই সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি কাজ হয়েছে। এরমধ্যে আছে, ইমরান মাহমুদুলের গাওয়া ‘না’, শেখ সাদির গাওয়া ‘দাঁড়িকমা’, কোভিড-১৯ নিয়ে লেখা ‘ঘরে থেকে যুদ্ধ জয়’ গেয়েছেন শেখ সাদি। একটি নাটকের টাইটেল গান হিসেবে ‘উথাল পাতাল প্রেম’ নামে একটি গান প্রকাশ পায়। এসব গান লকডাউনের মধ্যেই লেখা। হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে একটি কাজ চলমান আছে। সবমিলিয়ে সুস্থ্যভাবে ভালো কেটেছে।

| লিমনের গীতিকার হয়ে উঠা স্কুল জীবন থেকে অল্প অল্প করে চর্চার মাধ্যমে…। গান লেখা শুরু করেছিলেন কিছু না ভেবেই।

তিনি বলছিলেন, গান লেখা শুরু আসলে শখের বশে। কখনো ভাবিনি এটা থেকে আয় করব, আমার রুটি রুজি হবে। আমার স্বপ্নই ছিল, আমার গান হয়তো কোন একদিন মানুষ শুনবে, গাইবে। এক সময় দেখলাম অল্প অল্প করে লেখা থেকে একসময় পুরো গান লিখে ফেললাম। মনে হল, হয়ে গেছে তো। স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে। রাস্তায় চলার পথে অনেক সময় দেখি আমার লেখা গান মানুষ শুনছে, গাইছে।

প্রচুর গান শোনেন এই গীতিকার। ছোটবেলা থেকেই গানপ্রেমী তিনি। অন্য ভাষার গান বাংলায় রূপান্তরিত করে শোনেন। সব ধরণের গান শোনেন তিনি। শ্রোতা থেকে গান রচয়িতা। স্কুল জীবন থেকেই চর্চা শুরু করেন তিনি। প্রথমে দু’ এক লাইন, তারপর অনুকাব্য, সেখান থেকেই গানের জন্ম। তার বন্ধু শিল্পী প্রিতমসহ মূলত গান লেখার চর্চা শুরু।

| মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে তো পথচলা ৪ বছরের বেশি…

লিমন: আমি গান লিখতেছি ২০১০ সাল থেকে। প্রথম অ্যালবাম রিলিজ হয় ২০১৩ সালে। ফাইনালি রিলিজ হয় ২০১৪ সালে ভালবাসা দিবসে। কিন্তু আগে রিলিজ হয় প্রিতম হাসান ফিচারিং’কিছু প্রশ্ন’ নামে একটা অ্যালবাম। এরপর বেলাল খানের একটা অ্যালবামে আরেকটি গান রিলিজ হয়।

পড়ালেখায় অনিয়মিত ছিলেন তিনি। ২০১৪ সালের পর আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দেন। কিছু সময়ের জন্য গান লেখায় সময় না দিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১৬ সালে অনার্স সম্পন্ন করেন। আবার শুরু হয় গান লেখা। তিনি মনে করেন, এখান থেকেই তার ধারাবাহিক গান লেখা শুরু।

| যেহেতু শখ থেকে শুরু, পরে জনপ্রিয়তার সঙ্গে শ্রোতাদের প্রত্যাশা তো অনেক বেড়ে গেছে…

লিমন: আমাদের এখানে মানুষ বিভিন্ন রকম গান শোনে। এক এক শ্রেণির মানুষ এক এক ধরণের গান শোনে। আমি চাইতাম আমার গান যেন সবাই শোনে। আমি ভাগ করার চেষ্টা করতাম না। আমি সবসময় চিন্তা করতাম সকল মানুষের কিছু কিছু ফিলিংস আছে একই রকম। আপনার প্রেমিকা কিংবা আপনার বাবা মা এই মানুষদের ভাগ আপনি কখনো কাউকে দিতে চাইবেন না। এসব মানুষকে যতই ভালবাসেন কমবে না। এটা আমি ফিল করি। এই ফিলিংস হয়তো কখনো সেভাবে প্রকাশ করা হয় না। আমার কাছে গানের ফিলিংস এটাই, সহজভাবে মানুষের ভাষায় মানুষের মতো করে আমার অনুভূতি প্রকাশ করা। আমার প্রত্যেক গানে ভিন্ন স্টোরি দিয়ে লেখার চেষ্টা করি।

তিনি মনে করেন, মানুষ যখন কোন কিছু গ্রহণ করে তখন প্রত্যাশা বেড়ে যায়, দায়বদ্ধতা বেড়ে যায়। তার লেখা একটি গান ২০১৬ সালে শিল্পী এলিটার কণ্ঠে প্রকাশ পায়। সেই গান নিয়ে আছে এক গল্প। তিনি বলছিলেন, ইউটিউব থেকে এই গান এক ইন্দোনিশিয়ান শোনেন। ইন্দোনিশিয়ান লোকটি আমার এই গান বাংলা থেকে ইন্দোনিশিয়ান ভাষায় ট্রান্সলেট করে। সে এটা তাদের ভাষায় কাভার করে। আমাকে সে ফেসবুকে খুঁজে বের করে। পরে সে এটা আমাকে পাঠায়। এটা দেখে খুব ভালো লাগে। আমাদের পাশের দেশের গান বিশ্বব্যাপী শুনে। আমাদের মিউজিক তো ডেভেলপ হচ্ছে। আমাদের গান কেন বিশ্বব্যাপী শুনবে না। আমার স্বপ্ন এটাই, বাংলা গান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাক।

এখন পর্যন্ত লিমনের লেখা গানের সংখ্যা ১০০টিরও বেশি।
এর মধ্যে জনপ্রিয়  প্রকাশের অপেক্ষায়  

ইমরানের 'এমন একটা তুমি চাই', 'আমার কাছে তুমি অন্যরকম'। আসিফ আকবর ও কর্ণিয়ার 'কি করে তোকে বোঝাই'। মিনার এর 'চোখ' ও 'নেই'। তাহসানের 'ভালোবাসি তাই', 'অপ্রাপ্তি' ও 'ভালো আছি'। তানজিব সারওয়ারের 'কি মায়া' ও 'লজ্জাবতী'। মাহতিম সাকিবের 'রেখো তোমার করে' ও 'আনমনে'। এলিটা'র 'চোখেরই নীলে'। প্রীতম হাসানের 'উড়তে শেখা পাখি' ও 'দূরত্ব'। প্রত্যয় খানের 'অপরাধী'। শেখ সাদি'র 'দাঁড়ি-কমা' ও 'ললনা-২'

কুমার বিশ্বজিৎ এর 'ভুলে যেতে চাই', ইমরানের 'না' আসিফ আকবর ও পূজা'র 'তোমার অসুখ', মিনারের 'তোমার ভালো হোক', বেলাল খানের 'ভালোবাসা অদৃশ্য কান্না', কনা'র 'আড়ালে' এবং লায়লার 'কোন দুঃখ নাই' সহ আরো কিছু গান...

আসিফ আকবর, হাবিব ওয়াহিদ, তাহসান, মিনার রহমান, ইয়ামরানসহ অনেকের কণ্ঠে লিমনের লেখা গান বেশ জনপ্রিয়তা পায়। কুমার বিশ্বজিৎ থেকে শুরু অনেক পুরাতন সিনিয়র শিল্পীসহ এই সময়ের শিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা আছে এই গীতিকারের। তার ভাষ্যে, আমাদের যৌবন কেটেছে কুমার বিশ্বজিৎ দাদার গান শুনে। তখনকার আমাদের প্রেমের যে সুখকর অনুভূতি সেটা দাদার গান শুনেই পেতাম।

| আসিফ আকবরের গান শোনার মাধ্যমেই লিমনের গীতিকার হওয়ার স্বপ্ন দেখা। যেটা এখনো আসিফকে জানানো হয়নি।

তিনি বলছিলেন, আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে এখন আমার অনেক ভালো সম্পর্ক। আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে ১০টা গান করা হয়েছে। আসিফ ভাইয়ের গাওয়া গানের মধ্যে আমার লেখা গানই ইউটিউবে সর্বোচ্চ ভিউ। তিনি আমাকে একজন অভিভাবকের  মতো গাইডলাইন দেন। ইন্ডাস্ট্রির সবাই অনেক আদর করেন। আমি হয়তো সবার ছোট এই বলে। আমরা যারা এখন গান লিখছি সবার মধ্যে আমিই ছোট।

| এই সময়ে যারা গান করছেন, তাদের অনেককে নিয়ে সমালোচনা আছে। আপনার লেখা গানও গেয়েছেন তাদের অনেকে। আপনার অভিজ্ঞতা…

লিমন: আমার সাথে সবার সাথে ভালো সম্পর্ক। আমি শুরুতে মানুষকে অবজার্ভ করি। আমি যেটা সেটা তাদের বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। তাদের সঙ্গে এসব মেইনটেইন করে আমি কাজ করি। হালে যারা জনপ্রিয় তাদের কথা যদি বলি…। আমি সহজভাবে যদি বলি, আপনি যখন কোন একটা কিছু পেয়ে যাবেন, হিট হওয়ার একটা টেম্পার আছে, এটা সবাই নিতে পারে না। কারো মধ্যে এসব দেখলে মনে করি এসব তাদের মধ্যে থাকবে। আমি এসব কিছু নিয়ে ভাবিনা। আমি আমার কাজ করে যাই। আমি কাউকে নিয়ে এখন পর্যন্ত বিড়ম্বনা পাইনি।

| সবমিলিয়ে বেশ জনপ্রিয় এই গীতিকার আড়ালেই থাকতে পছন্দ করেন। এ নিয়ে আছে তার ভিন্ন এক চিন্তা…

লিমন: এটা সত্যি। আসলে এই আত্মতৃপ্তিটা আমি দূর থেকেই নিতে চাইতাম। মানুষ যে শুনছে (তার লেখা গান) তারা শুনে কি ভাবছে। মানুষের ফিডব্যাকটা পাওয়ার জন্য। সবাই আমাকে চিনে গেলে মানুষের ফিডব্যাকটা পাব না। আড়ালে থেকে যখন মানুষের ডিমান্ড শুনতে পাই এটা আমার অনুপ্রেরণা। আমার কোন গান কারো ভালো না লাগলে আমাকে না চিনলে আমার সামনেই হয়তো সেটা বলছে। ফলে ভুল্গুলো শুধরাতে পারছি। আমি মনে করি অধিক প্রচারে থাকলে আমার মধ্যে একটা ব্যাপার চলে আসতে পারে আমি তো অনেক কিছু হয়ে গেছি। এটা নিজের ভিতর চলে আসলে তখন আমি আর কিছু করতে পারব না।

| তবে এখন প্রচারে বা নিজের পরিচয় জানানোর বিষয়ে ভাবছেন তিনি। তিনি মনে করেন, অনেক কিছু এখন ক্লোন হচ্ছে। এ নিয়ে তিনিও ভয়ে আছেন।

লিমন বলেন, অনেকে বিশ্বাসও করতে চান না কোন একটা গান আমার। এখন আসলে মনে হয় নিজেকে চেনানোর প্রয়োজন। এখন মনে হয় প্রচারে না থাকা একটা অন্যায়।

| দায়িত্ব বেড়ে গেছে। দায়িত্বকে শুভ একটা বিষয় মনে করেন এই গীতিকার।

তিনি বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়তো কখনো ভুল করে ফেলি। ভুলটাকে আমি সবসময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম জিনিস হিসেবে দেখি। ভুলের মতো সুন্দর কিছু হয় না। আমার কাছে মনে হয় এই ভুলটা আমার একটা ইনভেস্টমেন্ট। এই ভুলটা আমাকে সামনে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিবে। সামনের পথ দেখিয়ে দেবে। যে ভুল করে সে প্রতিদিন শুধরায়।

| গীতিকার হওয়ায় আগের লিমন ও গীতিকার হওয়ার পরের লিমনের মধ্যে কোন পার্থক্য…

লিমন: এটা আসলে আমার কাছের মানুষরা ভালো বলতে পারবে। আমি নিজের কাছে নিজের সবসময় পরিবর্তন হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু মানুষের কাছে না, মানুষের কাছে কখনো এসব প্রকাশ করি না। সবার সাথে ঠিক আগের মতোই থাকতে চেষ্টা করি। নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলার মতো কিছু এখনো নিজের মধ্যে আসেনি। গানটা আসলে একটা ঐশ্বরিক ব্যাপার, এখানে এত উচ্চসিত হওয়ার কিছু নেই। চর্চা না করলে আমি এটা হারিয়েও ফেলতে পারি।

| আমরা বলতে পারি এখন শুধুই জনপ্রিয়তা গীতিকার লিমনের স্বপ্ন না…

লিমন: জনপ্রিয় হওয়া কিংবা জনপ্রিয়তা পাওয়া এসব নিয়ে আমি আসলে কখনো চিন্তাই করি না। আমার কাছে ভালোলাগা হচ্ছে, আমি যখন বারান্দায় দাঁড়াই  অনেক সময় দেখতে পাই মানুষ আমার গান শুনছে। আমাকে কিন্তু খুব বেশি মানুষ চিনে না। এখনো পরিচিতদের অনেককেই বলতেই হয় এটা আমার লেখা গান। আমার বন্ধুদেরকেও বলতে হয় এটা আমার গান। আমি কখনো চাইনি আমাকে কেউ চিনুক। মানুষ আমার গান শুনে তৃপ্তি পায়, এটাই আমার ভালোলাগা।

| তবে কি শুধুই আত্মতৃপ্তিতে সন্তুষ্ট লিমন?

লিমন: আমার আত্মতৃপ্তিটা আসলে খুব অল্পতেই। আমার যে উচ্চ আকাংখা সেটা হচ্ছে বাংলা গান নিয়ে। আমার একার পক্ষে হয়তো অনেক দূর নিয়ে যেতে পারব না।

| এই গীতিকার নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান। এমন প্রশ্ন করা হয় তাকে।

উত্তরে তিনি বললেন, আমি চাই আমার লেখা গান বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় শুনুক। বাংলা গান আরও সমৃদ্ধ হোক। বাংলা গান নিয়ে মানুষের মাঝে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সেটা কেটে যাক। বাংলা গান সুস্থ্য ধারায় ফিরে আসুক। বাংলা গান সবাই শুনুক। এই জায়গাটা থেকে আমার যতটুকু দেওয়ার আছে আমি দিয়ে যাব। শুরু থেকেই বলেছি আমি প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব করি না। আমার কাছে ফার্স্ট প্রাইওরিটি হচ্ছে মানুষের ইমোশন। যতদিন লেখার শক্তি পাব ততদিন পর্যন্ত আমি মানুষের জন্য লিখে যেতে চাই।

| গীতিকার জীবনের পথচলায় ভালো বা খারাপ অভিজ্ঞতা…

লিমন: শুরুতে ভালো বলি। আমার সবার সঙ্গে এখনো ভালো সম্পর্ক। হ্যাঁ, খারাপ হতেই পারে। তিক্ত যদি বলি, ছোট বয়স থেকেই একটা জিনিস খারাপ লাগে। এটা আমাদের প্রচলিত ক্ষোভ। আমাদের দেশে গীতিকারদের অবহেলার চোখে দেখা হয়। সিনিয়র শিল্পীরা গান করার সময় গীতিকারদের নাম বলেন। এখন যেটা দেখি, এখনকার শিল্পীরা বেশিরভাগ গীতিকারের নাম বলতে ভূলে যান। অনেক সময় তারা গীতিকারের নাম মনেও রাখেন না। তারা এসে গেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কে লিখল তারা তা জানার চেষ্টাও করেন না। এটা হচ্ছে আসলে এক প্রকার অবহেলা। এটা একটা দায়িত্বহীনতা। অনেক সময় দেখি অনেক গানেই গীতিকারের নাম নেই। এটা খুব ব্যাথিত করে। এটাই সবচেয়ে দুঃখের।

| জনপ্রিয় এই গীতিকারের আছে ক্ষোভ…

লিমন: আমাদের গানের মধ্যে মাঝে মাঝে অসুস্থ্য কিছু সংস্কৃতি ঢুকে যায়। এটা আমরা ছোটবেলা থেকে দেখেছি। এটা সবসময় আমরা দেখেছি। লিমনের ইচ্ছে, প্রকৃত বাংলা গান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাক।

| এত ভালো সৃষ্টি হওয়ার পরও আমরা পিছিয়ে কেন?

এই গীতিকার মনে করেন, এখানে প্রধান সমস্যা অর্থ। আমাদের পাশের দেশে একজন শিল্পীর সঙ্গে ৫০ জন পর্যন্ত মিউজিসিয়ান কাজ করে। তাদের ইনভেস্টমেন্ট বেশি। যেটা আমাদের এখানে অনেক কম। এটা একটা ব্যাপার হতে পারে। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে অনেক। আমাদের এখানে মার্কেট পলিসি সবাই বেশি বুঝে। আছে একাত্মতার অভাব।

| ইন্ডস্ট্রিতেও কী একাত্মতার অভাব?

লিমন: হ্যাঁ, ইন্ডাস্ট্রিতে কেন অভাব আমি বলি। ধরেন, কারো একটা গান প্রকাশ পেল। সে যেই হোক। গানটা ভালো লাগলে আমাদের লিডিং পর্যায়ে যত আর্টিস্ট আছেন তারা কেউ কি শেয়ার দিচ্ছেন, শেয়ার দিয়ে গানটা সম্পর্কে দু’ একলাইন লিখছেন, এটা তো কেউ করছেন না। পাশের দেশে এই চর্চাটা আছে। কিন্তু আমরাই অন্য দেশের গান টাইমলাইনে শেয়ার করছি। নিজেদেরটা করছি না। একটা ভালো গান করলাম সেটা কেউ শুনল না। ভালো ইনভেস্টমেন্ট নেই। ভালো প্রডিউসার নেই। এভাবেই ভালো গানও হারিয়ে যায়। এরকম অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।

লিমন আশা করছেন, এখন ধীরে ধীরে বাংলা গান বিশ্বব্যাপী পৌছাচ্ছে। আরও এগিয়ে যাবে। বিশ্ব দরবারে খুব অল্প সময়ে বাংলা গান ছড়িয়ে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন :

সাক্ষাৎকার এর আরও খবর

ডেটায় দেশ

সাক্ষাৎকার

আড়ালে থেকেই খুঁজেছি আত্মতৃপ্তি


রুবায়েত ইসলাম
বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ ইং ১৮:১৮


‘‘ভুলের মতো সুন্দর কিছু হয় না। আমার কাছে মনে হয় এই ভুলটা আমার একটা ইনভেস্টমেন্ট। এই ভুলটা আমাকে সামনে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিবে। সামনের পথ দেখিয়ে দেবে। যে ভুল করে সে প্রতিদিন শুধরায়।’’


 

গীতিকার মেহেদী হাসান লিমন। যার হাত দিয়ে অসংখ্য হিট গানের জন্ম। নিজে থাকেন প্রচার বিমুখ। এই গীতিকার গানের একজন বড় শ্রোতাও। যেকোন গান শোনেন। স্কুল জীবন থেকে দু’ একলাইন করে গান লেখা শুরু। তিনি দাবি করেন, তার গান শুধু এক শ্রেণির মানুষের জন্য না, তিনি গান রচনা করেন সবার জন্য। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব করেন না। গান রচনার মাধ্যমে মানুষের অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে চান তিনি। মানুষের ভালোলাগাই তার প্রাপ্তি। স্বপ্ন দেখেন বাংলা গানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার। যতদিন গান রচনা করার শক্তি থাকবে ততদিন তিনি চেষ্টা করবেন বাংলা গান যেন সারা বিশ্ব শোনে। নিউজরুমকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে আসে এসব কথা।।

| বিশ্ব মহামারিকালে থাকছেন ঘরেই। দেশে মহামারির প্রভাব শুরুর পর ঘরে থেকেই এ পর্যন্ত কয়েকটি কাজ করেছেন।

লিমন বলছিলেন: গেল পহেলা বৈশাখের জন্য করা অনেকগুলো কাজ ছিল। যেগুলো পরে ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায়। এই সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি কাজ হয়েছে। এরমধ্যে আছে, ইমরান মাহমুদুলের গাওয়া ‘না’, শেখ সাদির গাওয়া ‘দাঁড়িকমা’, কোভিড-১৯ নিয়ে লেখা ‘ঘরে থেকে যুদ্ধ জয়’ গেয়েছেন শেখ সাদি। একটি নাটকের টাইটেল গান হিসেবে ‘উথাল পাতাল প্রেম’ নামে একটি গান প্রকাশ পায়। এসব গান লকডাউনের মধ্যেই লেখা। হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে একটি কাজ চলমান আছে। সবমিলিয়ে সুস্থ্যভাবে ভালো কেটেছে।

| লিমনের গীতিকার হয়ে উঠা স্কুল জীবন থেকে অল্প অল্প করে চর্চার মাধ্যমে…। গান লেখা শুরু করেছিলেন কিছু না ভেবেই।

তিনি বলছিলেন, গান লেখা শুরু আসলে শখের বশে। কখনো ভাবিনি এটা থেকে আয় করব, আমার রুটি রুজি হবে। আমার স্বপ্নই ছিল, আমার গান হয়তো কোন একদিন মানুষ শুনবে, গাইবে। এক সময় দেখলাম অল্প অল্প করে লেখা থেকে একসময় পুরো গান লিখে ফেললাম। মনে হল, হয়ে গেছে তো। স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে। রাস্তায় চলার পথে অনেক সময় দেখি আমার লেখা গান মানুষ শুনছে, গাইছে।

প্রচুর গান শোনেন এই গীতিকার। ছোটবেলা থেকেই গানপ্রেমী তিনি। অন্য ভাষার গান বাংলায় রূপান্তরিত করে শোনেন। সব ধরণের গান শোনেন তিনি। শ্রোতা থেকে গান রচয়িতা। স্কুল জীবন থেকেই চর্চা শুরু করেন তিনি। প্রথমে দু’ এক লাইন, তারপর অনুকাব্য, সেখান থেকেই গানের জন্ম। তার বন্ধু শিল্পী প্রিতমসহ মূলত গান লেখার চর্চা শুরু।

| মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে তো পথচলা ৪ বছরের বেশি…

লিমন: আমি গান লিখতেছি ২০১০ সাল থেকে। প্রথম অ্যালবাম রিলিজ হয় ২০১৩ সালে। ফাইনালি রিলিজ হয় ২০১৪ সালে ভালবাসা দিবসে। কিন্তু আগে রিলিজ হয় প্রিতম হাসান ফিচারিং’কিছু প্রশ্ন’ নামে একটা অ্যালবাম। এরপর বেলাল খানের একটা অ্যালবামে আরেকটি গান রিলিজ হয়।

পড়ালেখায় অনিয়মিত ছিলেন তিনি। ২০১৪ সালের পর আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দেন। কিছু সময়ের জন্য গান লেখায় সময় না দিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১৬ সালে অনার্স সম্পন্ন করেন। আবার শুরু হয় গান লেখা। তিনি মনে করেন, এখান থেকেই তার ধারাবাহিক গান লেখা শুরু।

| যেহেতু শখ থেকে শুরু, পরে জনপ্রিয়তার সঙ্গে শ্রোতাদের প্রত্যাশা তো অনেক বেড়ে গেছে…

লিমন: আমাদের এখানে মানুষ বিভিন্ন রকম গান শোনে। এক এক শ্রেণির মানুষ এক এক ধরণের গান শোনে। আমি চাইতাম আমার গান যেন সবাই শোনে। আমি ভাগ করার চেষ্টা করতাম না। আমি সবসময় চিন্তা করতাম সকল মানুষের কিছু কিছু ফিলিংস আছে একই রকম। আপনার প্রেমিকা কিংবা আপনার বাবা মা এই মানুষদের ভাগ আপনি কখনো কাউকে দিতে চাইবেন না। এসব মানুষকে যতই ভালবাসেন কমবে না। এটা আমি ফিল করি। এই ফিলিংস হয়তো কখনো সেভাবে প্রকাশ করা হয় না। আমার কাছে গানের ফিলিংস এটাই, সহজভাবে মানুষের ভাষায় মানুষের মতো করে আমার অনুভূতি প্রকাশ করা। আমার প্রত্যেক গানে ভিন্ন স্টোরি দিয়ে লেখার চেষ্টা করি।

তিনি মনে করেন, মানুষ যখন কোন কিছু গ্রহণ করে তখন প্রত্যাশা বেড়ে যায়, দায়বদ্ধতা বেড়ে যায়। তার লেখা একটি গান ২০১৬ সালে শিল্পী এলিটার কণ্ঠে প্রকাশ পায়। সেই গান নিয়ে আছে এক গল্প। তিনি বলছিলেন, ইউটিউব থেকে এই গান এক ইন্দোনিশিয়ান শোনেন। ইন্দোনিশিয়ান লোকটি আমার এই গান বাংলা থেকে ইন্দোনিশিয়ান ভাষায় ট্রান্সলেট করে। সে এটা তাদের ভাষায় কাভার করে। আমাকে সে ফেসবুকে খুঁজে বের করে। পরে সে এটা আমাকে পাঠায়। এটা দেখে খুব ভালো লাগে। আমাদের পাশের দেশের গান বিশ্বব্যাপী শুনে। আমাদের মিউজিক তো ডেভেলপ হচ্ছে। আমাদের গান কেন বিশ্বব্যাপী শুনবে না। আমার স্বপ্ন এটাই, বাংলা গান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাক।

এখন পর্যন্ত লিমনের লেখা গানের সংখ্যা ১০০টিরও বেশি।
এর মধ্যে জনপ্রিয়  প্রকাশের অপেক্ষায়  

ইমরানের 'এমন একটা তুমি চাই', 'আমার কাছে তুমি অন্যরকম'। আসিফ আকবর ও কর্ণিয়ার 'কি করে তোকে বোঝাই'। মিনার এর 'চোখ' ও 'নেই'। তাহসানের 'ভালোবাসি তাই', 'অপ্রাপ্তি' ও 'ভালো আছি'। তানজিব সারওয়ারের 'কি মায়া' ও 'লজ্জাবতী'। মাহতিম সাকিবের 'রেখো তোমার করে' ও 'আনমনে'। এলিটা'র 'চোখেরই নীলে'। প্রীতম হাসানের 'উড়তে শেখা পাখি' ও 'দূরত্ব'। প্রত্যয় খানের 'অপরাধী'। শেখ সাদি'র 'দাঁড়ি-কমা' ও 'ললনা-২'

কুমার বিশ্বজিৎ এর 'ভুলে যেতে চাই', ইমরানের 'না' আসিফ আকবর ও পূজা'র 'তোমার অসুখ', মিনারের 'তোমার ভালো হোক', বেলাল খানের 'ভালোবাসা অদৃশ্য কান্না', কনা'র 'আড়ালে' এবং লায়লার 'কোন দুঃখ নাই' সহ আরো কিছু গান...

আসিফ আকবর, হাবিব ওয়াহিদ, তাহসান, মিনার রহমান, ইয়ামরানসহ অনেকের কণ্ঠে লিমনের লেখা গান বেশ জনপ্রিয়তা পায়। কুমার বিশ্বজিৎ থেকে শুরু অনেক পুরাতন সিনিয়র শিল্পীসহ এই সময়ের শিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা আছে এই গীতিকারের। তার ভাষ্যে, আমাদের যৌবন কেটেছে কুমার বিশ্বজিৎ দাদার গান শুনে। তখনকার আমাদের প্রেমের যে সুখকর অনুভূতি সেটা দাদার গান শুনেই পেতাম।

| আসিফ আকবরের গান শোনার মাধ্যমেই লিমনের গীতিকার হওয়ার স্বপ্ন দেখা। যেটা এখনো আসিফকে জানানো হয়নি।

তিনি বলছিলেন, আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে এখন আমার অনেক ভালো সম্পর্ক। আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে ১০টা গান করা হয়েছে। আসিফ ভাইয়ের গাওয়া গানের মধ্যে আমার লেখা গানই ইউটিউবে সর্বোচ্চ ভিউ। তিনি আমাকে একজন অভিভাবকের  মতো গাইডলাইন দেন। ইন্ডাস্ট্রির সবাই অনেক আদর করেন। আমি হয়তো সবার ছোট এই বলে। আমরা যারা এখন গান লিখছি সবার মধ্যে আমিই ছোট।

| এই সময়ে যারা গান করছেন, তাদের অনেককে নিয়ে সমালোচনা আছে। আপনার লেখা গানও গেয়েছেন তাদের অনেকে। আপনার অভিজ্ঞতা…

লিমন: আমার সাথে সবার সাথে ভালো সম্পর্ক। আমি শুরুতে মানুষকে অবজার্ভ করি। আমি যেটা সেটা তাদের বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। তাদের সঙ্গে এসব মেইনটেইন করে আমি কাজ করি। হালে যারা জনপ্রিয় তাদের কথা যদি বলি…। আমি সহজভাবে যদি বলি, আপনি যখন কোন একটা কিছু পেয়ে যাবেন, হিট হওয়ার একটা টেম্পার আছে, এটা সবাই নিতে পারে না। কারো মধ্যে এসব দেখলে মনে করি এসব তাদের মধ্যে থাকবে। আমি এসব কিছু নিয়ে ভাবিনা। আমি আমার কাজ করে যাই। আমি কাউকে নিয়ে এখন পর্যন্ত বিড়ম্বনা পাইনি।

| সবমিলিয়ে বেশ জনপ্রিয় এই গীতিকার আড়ালেই থাকতে পছন্দ করেন। এ নিয়ে আছে তার ভিন্ন এক চিন্তা…

লিমন: এটা সত্যি। আসলে এই আত্মতৃপ্তিটা আমি দূর থেকেই নিতে চাইতাম। মানুষ যে শুনছে (তার লেখা গান) তারা শুনে কি ভাবছে। মানুষের ফিডব্যাকটা পাওয়ার জন্য। সবাই আমাকে চিনে গেলে মানুষের ফিডব্যাকটা পাব না। আড়ালে থেকে যখন মানুষের ডিমান্ড শুনতে পাই এটা আমার অনুপ্রেরণা। আমার কোন গান কারো ভালো না লাগলে আমাকে না চিনলে আমার সামনেই হয়তো সেটা বলছে। ফলে ভুল্গুলো শুধরাতে পারছি। আমি মনে করি অধিক প্রচারে থাকলে আমার মধ্যে একটা ব্যাপার চলে আসতে পারে আমি তো অনেক কিছু হয়ে গেছি। এটা নিজের ভিতর চলে আসলে তখন আমি আর কিছু করতে পারব না।

| তবে এখন প্রচারে বা নিজের পরিচয় জানানোর বিষয়ে ভাবছেন তিনি। তিনি মনে করেন, অনেক কিছু এখন ক্লোন হচ্ছে। এ নিয়ে তিনিও ভয়ে আছেন।

লিমন বলেন, অনেকে বিশ্বাসও করতে চান না কোন একটা গান আমার। এখন আসলে মনে হয় নিজেকে চেনানোর প্রয়োজন। এখন মনে হয় প্রচারে না থাকা একটা অন্যায়।

| দায়িত্ব বেড়ে গেছে। দায়িত্বকে শুভ একটা বিষয় মনে করেন এই গীতিকার।

তিনি বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়তো কখনো ভুল করে ফেলি। ভুলটাকে আমি সবসময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম জিনিস হিসেবে দেখি। ভুলের মতো সুন্দর কিছু হয় না। আমার কাছে মনে হয় এই ভুলটা আমার একটা ইনভেস্টমেন্ট। এই ভুলটা আমাকে সামনে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিবে। সামনের পথ দেখিয়ে দেবে। যে ভুল করে সে প্রতিদিন শুধরায়।

| গীতিকার হওয়ায় আগের লিমন ও গীতিকার হওয়ার পরের লিমনের মধ্যে কোন পার্থক্য…

লিমন: এটা আসলে আমার কাছের মানুষরা ভালো বলতে পারবে। আমি নিজের কাছে নিজের সবসময় পরিবর্তন হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু মানুষের কাছে না, মানুষের কাছে কখনো এসব প্রকাশ করি না। সবার সাথে ঠিক আগের মতোই থাকতে চেষ্টা করি। নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলার মতো কিছু এখনো নিজের মধ্যে আসেনি। গানটা আসলে একটা ঐশ্বরিক ব্যাপার, এখানে এত উচ্চসিত হওয়ার কিছু নেই। চর্চা না করলে আমি এটা হারিয়েও ফেলতে পারি।

| আমরা বলতে পারি এখন শুধুই জনপ্রিয়তা গীতিকার লিমনের স্বপ্ন না…

লিমন: জনপ্রিয় হওয়া কিংবা জনপ্রিয়তা পাওয়া এসব নিয়ে আমি আসলে কখনো চিন্তাই করি না। আমার কাছে ভালোলাগা হচ্ছে, আমি যখন বারান্দায় দাঁড়াই  অনেক সময় দেখতে পাই মানুষ আমার গান শুনছে। আমাকে কিন্তু খুব বেশি মানুষ চিনে না। এখনো পরিচিতদের অনেককেই বলতেই হয় এটা আমার লেখা গান। আমার বন্ধুদেরকেও বলতে হয় এটা আমার গান। আমি কখনো চাইনি আমাকে কেউ চিনুক। মানুষ আমার গান শুনে তৃপ্তি পায়, এটাই আমার ভালোলাগা।

| তবে কি শুধুই আত্মতৃপ্তিতে সন্তুষ্ট লিমন?

লিমন: আমার আত্মতৃপ্তিটা আসলে খুব অল্পতেই। আমার যে উচ্চ আকাংখা সেটা হচ্ছে বাংলা গান নিয়ে। আমার একার পক্ষে হয়তো অনেক দূর নিয়ে যেতে পারব না।

| এই গীতিকার নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান। এমন প্রশ্ন করা হয় তাকে।

উত্তরে তিনি বললেন, আমি চাই আমার লেখা গান বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় শুনুক। বাংলা গান আরও সমৃদ্ধ হোক। বাংলা গান নিয়ে মানুষের মাঝে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সেটা কেটে যাক। বাংলা গান সুস্থ্য ধারায় ফিরে আসুক। বাংলা গান সবাই শুনুক। এই জায়গাটা থেকে আমার যতটুকু দেওয়ার আছে আমি দিয়ে যাব। শুরু থেকেই বলেছি আমি প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব করি না। আমার কাছে ফার্স্ট প্রাইওরিটি হচ্ছে মানুষের ইমোশন। যতদিন লেখার শক্তি পাব ততদিন পর্যন্ত আমি মানুষের জন্য লিখে যেতে চাই।

| গীতিকার জীবনের পথচলায় ভালো বা খারাপ অভিজ্ঞতা…

লিমন: শুরুতে ভালো বলি। আমার সবার সঙ্গে এখনো ভালো সম্পর্ক। হ্যাঁ, খারাপ হতেই পারে। তিক্ত যদি বলি, ছোট বয়স থেকেই একটা জিনিস খারাপ লাগে। এটা আমাদের প্রচলিত ক্ষোভ। আমাদের দেশে গীতিকারদের অবহেলার চোখে দেখা হয়। সিনিয়র শিল্পীরা গান করার সময় গীতিকারদের নাম বলেন। এখন যেটা দেখি, এখনকার শিল্পীরা বেশিরভাগ গীতিকারের নাম বলতে ভূলে যান। অনেক সময় তারা গীতিকারের নাম মনেও রাখেন না। তারা এসে গেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কে লিখল তারা তা জানার চেষ্টাও করেন না। এটা হচ্ছে আসলে এক প্রকার অবহেলা। এটা একটা দায়িত্বহীনতা। অনেক সময় দেখি অনেক গানেই গীতিকারের নাম নেই। এটা খুব ব্যাথিত করে। এটাই সবচেয়ে দুঃখের।

| জনপ্রিয় এই গীতিকারের আছে ক্ষোভ…

লিমন: আমাদের গানের মধ্যে মাঝে মাঝে অসুস্থ্য কিছু সংস্কৃতি ঢুকে যায়। এটা আমরা ছোটবেলা থেকে দেখেছি। এটা সবসময় আমরা দেখেছি। লিমনের ইচ্ছে, প্রকৃত বাংলা গান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাক।

| এত ভালো সৃষ্টি হওয়ার পরও আমরা পিছিয়ে কেন?

এই গীতিকার মনে করেন, এখানে প্রধান সমস্যা অর্থ। আমাদের পাশের দেশে একজন শিল্পীর সঙ্গে ৫০ জন পর্যন্ত মিউজিসিয়ান কাজ করে। তাদের ইনভেস্টমেন্ট বেশি। যেটা আমাদের এখানে অনেক কম। এটা একটা ব্যাপার হতে পারে। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে অনেক। আমাদের এখানে মার্কেট পলিসি সবাই বেশি বুঝে। আছে একাত্মতার অভাব।

| ইন্ডস্ট্রিতেও কী একাত্মতার অভাব?

লিমন: হ্যাঁ, ইন্ডাস্ট্রিতে কেন অভাব আমি বলি। ধরেন, কারো একটা গান প্রকাশ পেল। সে যেই হোক। গানটা ভালো লাগলে আমাদের লিডিং পর্যায়ে যত আর্টিস্ট আছেন তারা কেউ কি শেয়ার দিচ্ছেন, শেয়ার দিয়ে গানটা সম্পর্কে দু’ একলাইন লিখছেন, এটা তো কেউ করছেন না। পাশের দেশে এই চর্চাটা আছে। কিন্তু আমরাই অন্য দেশের গান টাইমলাইনে শেয়ার করছি। নিজেদেরটা করছি না। একটা ভালো গান করলাম সেটা কেউ শুনল না। ভালো ইনভেস্টমেন্ট নেই। ভালো প্রডিউসার নেই। এভাবেই ভালো গানও হারিয়ে যায়। এরকম অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।

লিমন আশা করছেন, এখন ধীরে ধীরে বাংলা গান বিশ্বব্যাপী পৌছাচ্ছে। আরও এগিয়ে যাবে। বিশ্ব দরবারে খুব অল্প সময়ে বাংলা গান ছড়িয়ে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন :


আড়ালে থেকেই খুঁজেছি আত্মতৃপ্তি

রুবায়েত ইসলাম বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ ইং ১৮:১৮ NewsRoom



‘‘ভুলের মতো সুন্দর কিছু হয় না। আমার কাছে মনে হয় এই ভুলটা আমার একটা ইনভেস্টমেন্ট। এই ভুলটা আমাকে সামনে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিবে। সামনের পথ দেখিয়ে দেবে। যে ভুল করে সে প্রতিদিন শুধরায়।’’


 

গীতিকার মেহেদী হাসান লিমন। যার হাত দিয়ে অসংখ্য হিট গানের জন্ম। নিজে থাকেন প্রচার বিমুখ। এই গীতিকার গানের একজন বড় শ্রোতাও। যেকোন গান শোনেন। স্কুল জীবন থেকে দু’ একলাইন করে গান লেখা শুরু। তিনি দাবি করেন, তার গান শুধু এক শ্রেণির মানুষের জন্য না, তিনি গান রচনা করেন সবার জন্য। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব করেন না। গান রচনার মাধ্যমে মানুষের অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে চান তিনি। মানুষের ভালোলাগাই তার প্রাপ্তি। স্বপ্ন দেখেন বাংলা গানকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার। যতদিন গান রচনা করার শক্তি থাকবে ততদিন তিনি চেষ্টা করবেন বাংলা গান যেন সারা বিশ্ব শোনে। নিউজরুমকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে আসে এসব কথা।।

| বিশ্ব মহামারিকালে থাকছেন ঘরেই। দেশে মহামারির প্রভাব শুরুর পর ঘরে থেকেই এ পর্যন্ত কয়েকটি কাজ করেছেন।

লিমন বলছিলেন: গেল পহেলা বৈশাখের জন্য করা অনেকগুলো কাজ ছিল। যেগুলো পরে ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায়। এই সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি কাজ হয়েছে। এরমধ্যে আছে, ইমরান মাহমুদুলের গাওয়া ‘না’, শেখ সাদির গাওয়া ‘দাঁড়িকমা’, কোভিড-১৯ নিয়ে লেখা ‘ঘরে থেকে যুদ্ধ জয়’ গেয়েছেন শেখ সাদি। একটি নাটকের টাইটেল গান হিসেবে ‘উথাল পাতাল প্রেম’ নামে একটি গান প্রকাশ পায়। এসব গান লকডাউনের মধ্যেই লেখা। হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে একটি কাজ চলমান আছে। সবমিলিয়ে সুস্থ্যভাবে ভালো কেটেছে।

| লিমনের গীতিকার হয়ে উঠা স্কুল জীবন থেকে অল্প অল্প করে চর্চার মাধ্যমে…। গান লেখা শুরু করেছিলেন কিছু না ভেবেই।

তিনি বলছিলেন, গান লেখা শুরু আসলে শখের বশে। কখনো ভাবিনি এটা থেকে আয় করব, আমার রুটি রুজি হবে। আমার স্বপ্নই ছিল, আমার গান হয়তো কোন একদিন মানুষ শুনবে, গাইবে। এক সময় দেখলাম অল্প অল্প করে লেখা থেকে একসময় পুরো গান লিখে ফেললাম। মনে হল, হয়ে গেছে তো। স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে। রাস্তায় চলার পথে অনেক সময় দেখি আমার লেখা গান মানুষ শুনছে, গাইছে।

প্রচুর গান শোনেন এই গীতিকার। ছোটবেলা থেকেই গানপ্রেমী তিনি। অন্য ভাষার গান বাংলায় রূপান্তরিত করে শোনেন। সব ধরণের গান শোনেন তিনি। শ্রোতা থেকে গান রচয়িতা। স্কুল জীবন থেকেই চর্চা শুরু করেন তিনি। প্রথমে দু’ এক লাইন, তারপর অনুকাব্য, সেখান থেকেই গানের জন্ম। তার বন্ধু শিল্পী প্রিতমসহ মূলত গান লেখার চর্চা শুরু।

| মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে তো পথচলা ৪ বছরের বেশি…

লিমন: আমি গান লিখতেছি ২০১০ সাল থেকে। প্রথম অ্যালবাম রিলিজ হয় ২০১৩ সালে। ফাইনালি রিলিজ হয় ২০১৪ সালে ভালবাসা দিবসে। কিন্তু আগে রিলিজ হয় প্রিতম হাসান ফিচারিং’কিছু প্রশ্ন’ নামে একটা অ্যালবাম। এরপর বেলাল খানের একটা অ্যালবামে আরেকটি গান রিলিজ হয়।

পড়ালেখায় অনিয়মিত ছিলেন তিনি। ২০১৪ সালের পর আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দেন। কিছু সময়ের জন্য গান লেখায় সময় না দিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১৬ সালে অনার্স সম্পন্ন করেন। আবার শুরু হয় গান লেখা। তিনি মনে করেন, এখান থেকেই তার ধারাবাহিক গান লেখা শুরু।

| যেহেতু শখ থেকে শুরু, পরে জনপ্রিয়তার সঙ্গে শ্রোতাদের প্রত্যাশা তো অনেক বেড়ে গেছে…

লিমন: আমাদের এখানে মানুষ বিভিন্ন রকম গান শোনে। এক এক শ্রেণির মানুষ এক এক ধরণের গান শোনে। আমি চাইতাম আমার গান যেন সবাই শোনে। আমি ভাগ করার চেষ্টা করতাম না। আমি সবসময় চিন্তা করতাম সকল মানুষের কিছু কিছু ফিলিংস আছে একই রকম। আপনার প্রেমিকা কিংবা আপনার বাবা মা এই মানুষদের ভাগ আপনি কখনো কাউকে দিতে চাইবেন না। এসব মানুষকে যতই ভালবাসেন কমবে না। এটা আমি ফিল করি। এই ফিলিংস হয়তো কখনো সেভাবে প্রকাশ করা হয় না। আমার কাছে গানের ফিলিংস এটাই, সহজভাবে মানুষের ভাষায় মানুষের মতো করে আমার অনুভূতি প্রকাশ করা। আমার প্রত্যেক গানে ভিন্ন স্টোরি দিয়ে লেখার চেষ্টা করি।

তিনি মনে করেন, মানুষ যখন কোন কিছু গ্রহণ করে তখন প্রত্যাশা বেড়ে যায়, দায়বদ্ধতা বেড়ে যায়। তার লেখা একটি গান ২০১৬ সালে শিল্পী এলিটার কণ্ঠে প্রকাশ পায়। সেই গান নিয়ে আছে এক গল্প। তিনি বলছিলেন, ইউটিউব থেকে এই গান এক ইন্দোনিশিয়ান শোনেন। ইন্দোনিশিয়ান লোকটি আমার এই গান বাংলা থেকে ইন্দোনিশিয়ান ভাষায় ট্রান্সলেট করে। সে এটা তাদের ভাষায় কাভার করে। আমাকে সে ফেসবুকে খুঁজে বের করে। পরে সে এটা আমাকে পাঠায়। এটা দেখে খুব ভালো লাগে। আমাদের পাশের দেশের গান বিশ্বব্যাপী শুনে। আমাদের মিউজিক তো ডেভেলপ হচ্ছে। আমাদের গান কেন বিশ্বব্যাপী শুনবে না। আমার স্বপ্ন এটাই, বাংলা গান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাক।

এখন পর্যন্ত লিমনের লেখা গানের সংখ্যা ১০০টিরও বেশি।
এর মধ্যে জনপ্রিয়  প্রকাশের অপেক্ষায়  

ইমরানের 'এমন একটা তুমি চাই', 'আমার কাছে তুমি অন্যরকম'। আসিফ আকবর ও কর্ণিয়ার 'কি করে তোকে বোঝাই'। মিনার এর 'চোখ' ও 'নেই'। তাহসানের 'ভালোবাসি তাই', 'অপ্রাপ্তি' ও 'ভালো আছি'। তানজিব সারওয়ারের 'কি মায়া' ও 'লজ্জাবতী'। মাহতিম সাকিবের 'রেখো তোমার করে' ও 'আনমনে'। এলিটা'র 'চোখেরই নীলে'। প্রীতম হাসানের 'উড়তে শেখা পাখি' ও 'দূরত্ব'। প্রত্যয় খানের 'অপরাধী'। শেখ সাদি'র 'দাঁড়ি-কমা' ও 'ললনা-২'

কুমার বিশ্বজিৎ এর 'ভুলে যেতে চাই', ইমরানের 'না' আসিফ আকবর ও পূজা'র 'তোমার অসুখ', মিনারের 'তোমার ভালো হোক', বেলাল খানের 'ভালোবাসা অদৃশ্য কান্না', কনা'র 'আড়ালে' এবং লায়লার 'কোন দুঃখ নাই' সহ আরো কিছু গান...

আসিফ আকবর, হাবিব ওয়াহিদ, তাহসান, মিনার রহমান, ইয়ামরানসহ অনেকের কণ্ঠে লিমনের লেখা গান বেশ জনপ্রিয়তা পায়। কুমার বিশ্বজিৎ থেকে শুরু অনেক পুরাতন সিনিয়র শিল্পীসহ এই সময়ের শিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা আছে এই গীতিকারের। তার ভাষ্যে, আমাদের যৌবন কেটেছে কুমার বিশ্বজিৎ দাদার গান শুনে। তখনকার আমাদের প্রেমের যে সুখকর অনুভূতি সেটা দাদার গান শুনেই পেতাম।

| আসিফ আকবরের গান শোনার মাধ্যমেই লিমনের গীতিকার হওয়ার স্বপ্ন দেখা। যেটা এখনো আসিফকে জানানো হয়নি।

তিনি বলছিলেন, আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে এখন আমার অনেক ভালো সম্পর্ক। আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে ১০টা গান করা হয়েছে। আসিফ ভাইয়ের গাওয়া গানের মধ্যে আমার লেখা গানই ইউটিউবে সর্বোচ্চ ভিউ। তিনি আমাকে একজন অভিভাবকের  মতো গাইডলাইন দেন। ইন্ডাস্ট্রির সবাই অনেক আদর করেন। আমি হয়তো সবার ছোট এই বলে। আমরা যারা এখন গান লিখছি সবার মধ্যে আমিই ছোট।

| এই সময়ে যারা গান করছেন, তাদের অনেককে নিয়ে সমালোচনা আছে। আপনার লেখা গানও গেয়েছেন তাদের অনেকে। আপনার অভিজ্ঞতা…

লিমন: আমার সাথে সবার সাথে ভালো সম্পর্ক। আমি শুরুতে মানুষকে অবজার্ভ করি। আমি যেটা সেটা তাদের বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। তাদের সঙ্গে এসব মেইনটেইন করে আমি কাজ করি। হালে যারা জনপ্রিয় তাদের কথা যদি বলি…। আমি সহজভাবে যদি বলি, আপনি যখন কোন একটা কিছু পেয়ে যাবেন, হিট হওয়ার একটা টেম্পার আছে, এটা সবাই নিতে পারে না। কারো মধ্যে এসব দেখলে মনে করি এসব তাদের মধ্যে থাকবে। আমি এসব কিছু নিয়ে ভাবিনা। আমি আমার কাজ করে যাই। আমি কাউকে নিয়ে এখন পর্যন্ত বিড়ম্বনা পাইনি।

| সবমিলিয়ে বেশ জনপ্রিয় এই গীতিকার আড়ালেই থাকতে পছন্দ করেন। এ নিয়ে আছে তার ভিন্ন এক চিন্তা…

লিমন: এটা সত্যি। আসলে এই আত্মতৃপ্তিটা আমি দূর থেকেই নিতে চাইতাম। মানুষ যে শুনছে (তার লেখা গান) তারা শুনে কি ভাবছে। মানুষের ফিডব্যাকটা পাওয়ার জন্য। সবাই আমাকে চিনে গেলে মানুষের ফিডব্যাকটা পাব না। আড়ালে থেকে যখন মানুষের ডিমান্ড শুনতে পাই এটা আমার অনুপ্রেরণা। আমার কোন গান কারো ভালো না লাগলে আমাকে না চিনলে আমার সামনেই হয়তো সেটা বলছে। ফলে ভুল্গুলো শুধরাতে পারছি। আমি মনে করি অধিক প্রচারে থাকলে আমার মধ্যে একটা ব্যাপার চলে আসতে পারে আমি তো অনেক কিছু হয়ে গেছি। এটা নিজের ভিতর চলে আসলে তখন আমি আর কিছু করতে পারব না।

| তবে এখন প্রচারে বা নিজের পরিচয় জানানোর বিষয়ে ভাবছেন তিনি। তিনি মনে করেন, অনেক কিছু এখন ক্লোন হচ্ছে। এ নিয়ে তিনিও ভয়ে আছেন।

লিমন বলেন, অনেকে বিশ্বাসও করতে চান না কোন একটা গান আমার। এখন আসলে মনে হয় নিজেকে চেনানোর প্রয়োজন। এখন মনে হয় প্রচারে না থাকা একটা অন্যায়।

| দায়িত্ব বেড়ে গেছে। দায়িত্বকে শুভ একটা বিষয় মনে করেন এই গীতিকার।

তিনি বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়তো কখনো ভুল করে ফেলি। ভুলটাকে আমি সবসময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম জিনিস হিসেবে দেখি। ভুলের মতো সুন্দর কিছু হয় না। আমার কাছে মনে হয় এই ভুলটা আমার একটা ইনভেস্টমেন্ট। এই ভুলটা আমাকে সামনে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিবে। সামনের পথ দেখিয়ে দেবে। যে ভুল করে সে প্রতিদিন শুধরায়।

| গীতিকার হওয়ায় আগের লিমন ও গীতিকার হওয়ার পরের লিমনের মধ্যে কোন পার্থক্য…

লিমন: এটা আসলে আমার কাছের মানুষরা ভালো বলতে পারবে। আমি নিজের কাছে নিজের সবসময় পরিবর্তন হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু মানুষের কাছে না, মানুষের কাছে কখনো এসব প্রকাশ করি না। সবার সাথে ঠিক আগের মতোই থাকতে চেষ্টা করি। নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলার মতো কিছু এখনো নিজের মধ্যে আসেনি। গানটা আসলে একটা ঐশ্বরিক ব্যাপার, এখানে এত উচ্চসিত হওয়ার কিছু নেই। চর্চা না করলে আমি এটা হারিয়েও ফেলতে পারি।

| আমরা বলতে পারি এখন শুধুই জনপ্রিয়তা গীতিকার লিমনের স্বপ্ন না…

লিমন: জনপ্রিয় হওয়া কিংবা জনপ্রিয়তা পাওয়া এসব নিয়ে আমি আসলে কখনো চিন্তাই করি না। আমার কাছে ভালোলাগা হচ্ছে, আমি যখন বারান্দায় দাঁড়াই  অনেক সময় দেখতে পাই মানুষ আমার গান শুনছে। আমাকে কিন্তু খুব বেশি মানুষ চিনে না। এখনো পরিচিতদের অনেককেই বলতেই হয় এটা আমার লেখা গান। আমার বন্ধুদেরকেও বলতে হয় এটা আমার গান। আমি কখনো চাইনি আমাকে কেউ চিনুক। মানুষ আমার গান শুনে তৃপ্তি পায়, এটাই আমার ভালোলাগা।

| তবে কি শুধুই আত্মতৃপ্তিতে সন্তুষ্ট লিমন?

লিমন: আমার আত্মতৃপ্তিটা আসলে খুব অল্পতেই। আমার যে উচ্চ আকাংখা সেটা হচ্ছে বাংলা গান নিয়ে। আমার একার পক্ষে হয়তো অনেক দূর নিয়ে যেতে পারব না।

| এই গীতিকার নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান। এমন প্রশ্ন করা হয় তাকে।

উত্তরে তিনি বললেন, আমি চাই আমার লেখা গান বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় শুনুক। বাংলা গান আরও সমৃদ্ধ হোক। বাংলা গান নিয়ে মানুষের মাঝে যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সেটা কেটে যাক। বাংলা গান সুস্থ্য ধারায় ফিরে আসুক। বাংলা গান সবাই শুনুক। এই জায়গাটা থেকে আমার যতটুকু দেওয়ার আছে আমি দিয়ে যাব। শুরু থেকেই বলেছি আমি প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব করি না। আমার কাছে ফার্স্ট প্রাইওরিটি হচ্ছে মানুষের ইমোশন। যতদিন লেখার শক্তি পাব ততদিন পর্যন্ত আমি মানুষের জন্য লিখে যেতে চাই।

| গীতিকার জীবনের পথচলায় ভালো বা খারাপ অভিজ্ঞতা…

লিমন: শুরুতে ভালো বলি। আমার সবার সঙ্গে এখনো ভালো সম্পর্ক। হ্যাঁ, খারাপ হতেই পারে। তিক্ত যদি বলি, ছোট বয়স থেকেই একটা জিনিস খারাপ লাগে। এটা আমাদের প্রচলিত ক্ষোভ। আমাদের দেশে গীতিকারদের অবহেলার চোখে দেখা হয়। সিনিয়র শিল্পীরা গান করার সময় গীতিকারদের নাম বলেন। এখন যেটা দেখি, এখনকার শিল্পীরা বেশিরভাগ গীতিকারের নাম বলতে ভূলে যান। অনেক সময় তারা গীতিকারের নাম মনেও রাখেন না। তারা এসে গেয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কে লিখল তারা তা জানার চেষ্টাও করেন না। এটা হচ্ছে আসলে এক প্রকার অবহেলা। এটা একটা দায়িত্বহীনতা। অনেক সময় দেখি অনেক গানেই গীতিকারের নাম নেই। এটা খুব ব্যাথিত করে। এটাই সবচেয়ে দুঃখের।

| জনপ্রিয় এই গীতিকারের আছে ক্ষোভ…

লিমন: আমাদের গানের মধ্যে মাঝে মাঝে অসুস্থ্য কিছু সংস্কৃতি ঢুকে যায়। এটা আমরা ছোটবেলা থেকে দেখেছি। এটা সবসময় আমরা দেখেছি। লিমনের ইচ্ছে, প্রকৃত বাংলা গান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাক।

| এত ভালো সৃষ্টি হওয়ার পরও আমরা পিছিয়ে কেন?

এই গীতিকার মনে করেন, এখানে প্রধান সমস্যা অর্থ। আমাদের পাশের দেশে একজন শিল্পীর সঙ্গে ৫০ জন পর্যন্ত মিউজিসিয়ান কাজ করে। তাদের ইনভেস্টমেন্ট বেশি। যেটা আমাদের এখানে অনেক কম। এটা একটা ব্যাপার হতে পারে। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে অনেক। আমাদের এখানে মার্কেট পলিসি সবাই বেশি বুঝে। আছে একাত্মতার অভাব।

| ইন্ডস্ট্রিতেও কী একাত্মতার অভাব?

লিমন: হ্যাঁ, ইন্ডাস্ট্রিতে কেন অভাব আমি বলি। ধরেন, কারো একটা গান প্রকাশ পেল। সে যেই হোক। গানটা ভালো লাগলে আমাদের লিডিং পর্যায়ে যত আর্টিস্ট আছেন তারা কেউ কি শেয়ার দিচ্ছেন, শেয়ার দিয়ে গানটা সম্পর্কে দু’ একলাইন লিখছেন, এটা তো কেউ করছেন না। পাশের দেশে এই চর্চাটা আছে। কিন্তু আমরাই অন্য দেশের গান টাইমলাইনে শেয়ার করছি। নিজেদেরটা করছি না। একটা ভালো গান করলাম সেটা কেউ শুনল না। ভালো ইনভেস্টমেন্ট নেই। ভালো প্রডিউসার নেই। এভাবেই ভালো গানও হারিয়ে যায়। এরকম অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।

লিমন আশা করছেন, এখন ধীরে ধীরে বাংলা গান বিশ্বব্যাপী পৌছাচ্ছে। আরও এগিয়ে যাবে। বিশ্ব দরবারে খুব অল্প সময়ে বাংলা গান ছড়িয়ে যাবে।


2020 All Rights Reserved | www.newsroombd.com.bd
+8801554927951 info@newsroom.com.bd